প্রিয় শিক্ষার্থীরা কেমন আছো আশা করি ভালো আছো, আজকে তোমাদের জন্য আমরা নিয়ে এসেছি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন ভাবসম্প্রসারণ “পাপীকে নয়, পাপকে ঘৃণা কর ”। চলো এই ভাবসম্প্রসারণটি পড়ে নেয়।
পাপীকে নয়, পাপকে ঘৃণা কর ভাবসম্প্রসারণ
পাপ-পূণ্য বা ন্যায়-অন্যায় নিয়েই আমাজের কর্মজীবন। যিনি পাপ করেন তিনিই পাপী। তার নিজ কর্মের জন্য পাপী যতটা না দায়ী তার চেয়ে বেশি দায়ী তার সমাজবাস্তবতা। তাই পাপীকে দোষ না দিয়ে পাপকে ঘৃণা করাই উত্তম কাজ।
মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। আর এ শ্রেষ্ঠত্বের প্রধান কারণ মানুষের বিবেক-বুদ্ধি আছে, যা অন্য কোন জীবের নেই। এ বিবেকের কারণেই মানুষ ভাল-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় বোঝতে সক্ষম হয়। বিবেক মানুষকে সত্যের পথে পরিচালিত করে, অন্যায় কাজে বাধা দেয। বিবেকের কারণেই মানুষ সকল অপরাধমূলক কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকে। এই অপরাধমূলক কার্যকলাপই পাপ নামে অভিহিত হয়। যেসব ব্যক্তি পাপাচারে লিপ্ত হয় তারাই পাপী। মানুষ সাধারণত পাপীকে ঘৃণা করে। কিন্তু পাপীকে ঘৃণা না করে পাপকে ঘৃণা করাই সমচীন। কেননা, পাপী অন্যান্যদের মতোই একজন সাধারণ মানুষ। তার পাপী হওয়ার কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে যে, সামাজিক প্রতিকূলতাই তার এই পাপ কার্যের পেছনে নিহিত। জীবন সংগ্রামমুখর। সংগ্রাম করেই মানুষকে প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে টিকে থাকতে হয়। জীবনকে গতিশীল রাখার জন্য মানুষ অনেক সময় খারপ পথে ধাবিত হয়। জীবিকার তাগিদেই মানুষকে অনেক সময় খারাপ কাজের আশ্রয় নিতে হয়। জীবিকার তাগিদেই মানুষকে বেছে নিতে হয় নানা কূটকৌশল, হত্যা, প্রতারণা, শঠতার মতো বীভৎস কার্যক্রম। মানুষ কখনো স্বেচ্ছায় এসব কাজে জড়ায় না বা জড়াতে পারে না। তার অস্তিত্বের সংকট কিংবা প্রতিকূল পারিপার্শ্বিকতাই তাকে এ পথে ঠেলে দেয়। তখন সে তার কামনা চরিতার্থ করার জন্য কিংবা দারিদ্র্য থেকে মুক্তির আশায় কিংবা স্বার্থ সিদ্ধির আশায় নিজের বিবেক-বুদ্ধি জলাঞ্জলি দিয়ে পাপের পথ অনুসরণ করে। পরিণতিতে সে হয়ে পড়ে পাপী। এ অবস্থায় তার বিবেক-বুদ্ধি লোপ পায় বলে তার কোন হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। কিন্তু যখনই তার হিতাহিত জ্ঞান ফিরে আসে এবং বিবেকের পুনর্জারণ ঘটে তখনই সে তার অতীত পাপের জন্য অনুতপ্ত হৃদয়ে অনুশোচনার জন্য যেকোন শাস্তি মাথা পেতে নিতে দ্বিধাবোধ করে না। তাই এসব মানুষকে ঘৃণা করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাতে পাপী ব্যক্তিটির সুপথে আসার পথ বন্ধ হয়ে যায়। অপরপক্ষে যদি সেই খারাপ কর্মটিকে তথা পাপকে ঘৃণা করা যায় তাহলে মানুষ আর সে পথে ধাবিত হবে না। পাপ আছে বলেই পাপীর সৃষ্টি। তাই প্রথমেই উচিত সমাজকে পাপমুক্ত করা। সমাজে পাপ না থাকলে পাপীর জন্ম হবে না।
মানুষকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। পাপকে ঘৃণা করেই পাপ নির্মূল সম্ভব। পাপীকে ঘৃণা করলে পাপ আরো বেড়েই চলে।
বিকল্প ১
পাপ পুণ্য মিলেই এ দুনিয়া। পাপ অপবিত্র কিন্তু পাপী অপবিত্র নয়। কেননা, সে পাপ কলুষিত। তাই পাপীকে নয় বরং পাপকে ঘৃণা করতে হবে।
পাপ বলতে আমরা অন্যায় অবিহিত কাজ, অধর্মকে বুঝি। যে অন্যায় কাজ, অধর্মের কাজ করে, তাকে আমরা পাপী বলি। সাধারণভাবে আমরা পাপ ও পাপী উভয়কেই ঘৃণা করি; কিন্তু এটা ঠিক নয়। পাপ অবশ্যই ঘৃণার কাজ, কারও জন্যই তা বাঞ্ছনীয় নয়। পাপের ফলে মানুষের ইহকাল ও পরকাল দু-ই নষ্ট হয়। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। পৃথিবীতে যখন একটি শিশু ভূমিষ্ঠ হয় তখন সে থাকে নিষ্পাপ। তার বয়োবৃদ্ধির সাথে সাথে চাওয়া-পাওয়ার প্রসার ঘটে। না চাইতেই যে পায় সে হয়ত এ সংঘাতকে এড়াতে পারে। কিন্তু যে শিশু অন্মের পর থেকে বা পরবর্তীতে বিরূপ পরিবেশে বড় হয়, দুঃখকষ্ট, ক্ষুধা আর নির্যাতনের সাথে যার বাস, জীবনের প্রয়োজনে তার পক্ষে সমাজের নিষিদ্ধ পথে, পাপের পঙ্কিল পথে পা বাড়ানো অস্বাভাবিক নয়। বাধ্য হয়েই সে পাপী হয। কিন্তু জন্মের সময় তো সে পাপী ছিল না। বরং পরিবেশের প্রতিকূলতাই তাকে পাপী করেছে। অনুকূল পরিবেশ পেলে; স্নেহের, ভালোবাসার একটু পরশ পেলে হয়তো বা তার হৃদয়ে সৃষ্টি হতে পারে অনুতাপের অমিয় ধারা।
এ জগতে এমন অনেক উদাহরণ আছে, যাঁরা জীবনের একটি সময়ে অনেক পাপ কাজ করেছেন কিন্তু পরবর্তী জীবনে তাঁরাই মানবকুলের শিরোমণি হিসেবে নিজেদের স্থান নিশ্চিত করেছেন। উদাহরণ হিসেবে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর (রা.)-এর কথা বলা যায় যিনি ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ (স.)-কে হত্যার জন্য উন্মুক্ত তরবারি নিয়ে হযরত (স.)-এর দিকে ছুটে গিয়েছিলেন কিন্তু পরবর্তী জীবনে তিনি হয়েছেন আদর্শ পুরুষ। তাই পাপীকে ঘৃণা করে সমাজকে কলুষমুক্ত করা সম্ভব নয়। সেজন্যই পবিত্র হাদিসে বলা হয়েছে, ”তোমাদের মধ্যে কেউ কোনো পাপকার্য অনুষ্ঠিত হতে দেখলে সে যেন হাত দিয়ে তাকে বাধ দেয়; নয়তো মুখ দিয়ে তা নিষেধ করে। আর যদি তাও না পারে তবে যেন অন্তত অন্তর দিয়ে সেই পাপকার্যকে ঘৃণা করে।” পাপ তাই সর্বদা বর্জনীয়; কিন্তু পাপীকে বর্জন করা বা ঘৃণা করা ঠিক নয়। কেননা মানুষ অনেক সময়ই পাপ করে নানা কারণে বা অবস্থার বিপাকে পড়ে। ইচ্ছা করে হয়তো সে তা করে নি। অথবা অজ্ঞতার কারণে কিংবা অভাব অনটনে পড়ে বা রিপুর তাড়নায় বাধ্য হয়ে সে পাপ করেছে। অনেকে পরিণাম না বুঝে অনেক কাজ করে যা অত্যন্ত খারাপ, কিন্তু তাদের বুঝিয়ে বললে তখন সে পাপের জন্য তারা অনুশোচনা করে, অনুতপ্ত হয়। এমতাবস্থায় পাপীকে ঘৃণা করা কখনো ঠিক নয়। বরং ক্ষমা করে মহত্ত্ব দিয়ে পাপীকে কাছে টেনে নিলে পাপীও পাপের পথ ছেড়ে সুপথে ফিরে আসে। মহনবী হযরত মুহম্মদ (স.) তাঁর অশেষ ক্ষমাগুণ দিয়ে পাপীকে সৎপথে ফিরিয়ে এনেছিলেন।
পাপীকে ঘৃণা করা যাবে না। পাপকে ঘৃণা করতে হবে, পাপীকে ক্ষমার মাধ্যমে সুপথে ফিরিয়ে আনতে হবে।
বিকল্প ২
মূলভাব: কোনাে মানুষই পাপী হয়ে জন্মায় না। প্রতিকূল পরিবেশে পাপ মানুষকে কলুষিত ও কলঙ্কিত করে তােলে। সুতরাং, পাপী বলে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না, কেননা সে স্বেচ্ছায় পাপী হয়নি। তাই পাপীকে নয়, তার পাপী হয়ে ওঠার কারণ তথা পাপকে ঘৃণা করা উচিত।
ভাবসম্প্রসারণ: প্রতিটি মানুষই সুখী, নির্বিঘ্ন জীবন অতিবাহিত করতে চায়, কিন্তু সবসময় সৎ জীবনযাপন করা সবার পক্ষে সম্ভবপর হয়ে ওঠে । নিয়তির খেলায় জীবনধারণের জন্যে অনেক মানুষকে অনিচ্ছাসত্ত্বেও অসৎ পন্থা বেছে নিতে হয়। সে জড়িয়ে পড়ে অন্যায় কাজে, অসৎ কাজে। আবার দেখা যায়, যে মানুষ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রাখে সেও নানা কারণবশত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। জড়িয়ে পড়ে পাশবিক ও অমানবিক কাজে। তখন সে চিহ্নিত হয় পাপী হিসেবে। অথচ এরা কেউ জন্মগতভাবে পাপী ছিল না। কখনাে নােংরা পরিবেশ, প্রতিকূল সমাজের বিষাক্ত আবহাওয়া, দুর্জনের সাহচর্য অথবা অভিভাবকের তত্ত্বাবধানের জুটি মানুষকে অসৎ পথে ঠেলে দেয়। আবার অনেক সময় ভালাে মানুষও রাগে, ক্ষোভে, দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে পাপ নামক জঘন্য কাজে জড়িয়ে পড়ে। এ ধরনের মানুষরা পরে অনুশােচনার আগুনে দগ্ধ হয়। এদেরকে পাপী ভেবে, পাপের কারণ অনুসন্ধান করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। শুধু পাপী ভেবে শাস্তি দিলে পাপের মাত্রা আরও বেড়ে যাবে। এমনকি ফলাফল ভয়ংকরও হতে পারে। আবার পাপীকে তার পাপ কর্মের জন্যে ঘৃণা না করলে অনেক সময় পাপের মাত্রা সমাজে আরও বেড়ে যেতে থাকে। তাই মানবিক দৃষ্টিকোণ দিয়ে সমাজ ও দেশের কথা ভেবে, সর্বোপরি সূক্ষ্মভাবে বিচারবিশ্লেষণ করে পাপীর পাপ কাজের বিচার করা উচিত। অনেক পাপী তার পাপ কাজের জন্যে অনুশােচনায় দগ্ধীভূত হয়, আবার অনেকের মধ্যে লেশমাত্র অনুতপ্ত ভাব দেখা যায় না।
পাপী এবং পাপের মূল্যায়ন আমাদের সঠিকভাবে করা উচিত। পাপীকে ঘৃণা না করে তার প্রতি যদি সহানুভূতি দেখানাে হয় এবং ভুল সংশােধনের সুযােগ দেওয়া হয় এবং সমাজ থেকে অপরাধের উৎস নির্মূল করা যায় তাহলে সমাজে অপরাধীদের সংখ্যা কমে আসবে।
বিকল্প ৩
মূলভাব : কোনো মানুষই পাপী হয়ে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে না। সার্বিক পরিস্থিতিই তাকে পাপ কাজে লিপ্ত করে। তাই পাপীকে ঘৃণা না করে পাপকেই ঘৃণা করা উচিত।
ভাব-সম্প্রসারণ : অন্যান্য প্রাণীর সাথে মানুষের পার্থক্য এই যে, মানুষ সামাজিক জীব। সে খুব সহজেই নিজেে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তবে কখনো কখনো এর ব্যত্যয় ঘটে। বিভিন্ন কারণবশত সে নিয়ন্ত্রণ হরিয়ে ফেলে। এর ফলে সে পাশবিক কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে। তখন সে সবার মাঝে চিহ্নিত হয় ‘পাপী’ হিসেবে। কিন্তু সে তো আর পাপী হয়ে জন্মগ্রহণ করেনি। সে হয়তো চেয়েছিল সুন্দরভাবে জীবনযাপন করতে। মানুষের মতো মানুষ হয়ে সমাজের বুকে মাথা উঁচু করে চলতে। কিন্তু তা সে পারেনি। কেন পারেনি? এর কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে এর জন্য কেউ না কেউ অবশ্যই দায়ী। হয়তো ক্লেদাক্ত কোনো পরিবেশের মধ্যে সে বেড়ে উঠেছে। অথবা পঙ্কিল সমাজের বিষাক্ত আবহাওয়া গ্রাস করেছে তার মনের সুকুমার বৃত্তি। কিংবা নষ্ট অভিভাবকের তত্ত্বাবধানে সে বেড়ে উঠেছে একজন নষ্ট মানুষ হয়ে। অনেক সময় একজন শান্ত স্বাভাবিক মানুষও উত্তেজনার বশে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। অপ্রকৃতিস্থ অবস্থায় সে মুহূর্তের মধ্যে এমন কাজ করে ফলে যে, পরে সে কারণে অনুশোচনার আগুনে দগ্ধ হয়। কিন্তু আমরা তাকে শুদ্ধ হওয়ার কোনো সুযোগ দেই না। বরং তার গায়ে কলঙ্কের কালিমা লেপন করতে সচেষ্ট হই। আমাদের এই ধরনের মানসিকতা ঠিক নয়। এতে করে পাপের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। পাপীর অন্তরে তখন যে চিতা জ্বলে, তার আগুনে সে আরও অগ্নিকান্ড ঘটায়। কাজেই পাপীকে ঘৃণার চোখে না দেখে মানবিকভাবে তার বিশ্লেষণ করা উচিত। এটা নিশ্চিত যে, যদি পাপীকে ঘৃণা না করে তাকে সংশোধনের সুযোগ দেয়া হয়, তাহলে সমাজে পাপের মাত্রা অনেক কমে যাবে । তাইতো মনীষীরা বলেছেন, ‘পাপকে ঘৃণা কর, পাপীকে নয়।’ পাপ থেকে দূরে থাকতে হবে কিন্তু পাপীকে বুকে টানতে হবে।
মন্তব্য: আমাদের উচিত পাপকে ঘৃণা করে তা থেকে দূরে থাকা। আর পাপীকে ঘৃণা না করে তাকে পাপ কাজ থেকে বিরত রাখার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
আশা করি তোমরা এই ভাবসম্প্রসারণটি বুঝতে পেরেছো। আমাদের সাথেই থাকো।