আমাদের সবার ইতিহাস জানা দরকার। তার মধ্যে “পত্রসাহিত্য কাকে বলে? ডায়েরি কাকে বলে? পত্র ও ডায়েরির পার্থক্য উদাহরণ সহ বুঝিয়ে দাও।” এই বিষয়টি অবশ্যই জানতে হবে। এটি জানলে আপনার ইতিহাস সম্বন্ধে আরো ধারণা বেড়ে যাবে। আসেন যেনে নেয়।
পত্রসাহিত্য কাকে বলে? ডায়েরি কাকে বলে? পত্র ও ডায়েরির পার্থক্য উদাহরণ সহ বুঝিয়ে দাও
একদা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন : যারা ভালো চিঠি লেখে তারা মনের জানালার ধারে বসে আলাপ করে যায় তার কোনো ভাব নেই, বেগও নেই, স্রোত আছে। ভাবহীন সহজের রসই হচ্ছে চিঠির রস। ব্যক্তিগত প্রয়োজনের তাগিদে মানুষ চিঠি লিখলেও সে চিঠির মধ্যে যদি লেখকের অন্তরের রঙে রসে অনুরঞ্জিত সঞ্জীবিত হয়ে ওঠার ভাব পরিস্ফুট হয় তবে সেটি পত্রসাহিত্যে উত্তীর্ণ হয়। সর্বদা স্মরণ রাখা দরকার পত্র ও পত্রসাহিত্যের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান। পত্র একেবারে বৈষয়িক, প্রয়োজনভিত্তিক, প্রাপক সেখানে পাঠক মাত্র, বিশেষ উদ্দেশ্য বা প্রয়োজনই সেখানে মুখ্য। পত্র যখন সাহিত্য হয়ে ওঠে সেখানে প্রয়োজন গৌণ মাত্র। মনের মানুষের কাছে লেখক যখন তাঁর অন্তরের আবেগকে উন্মোচিত করে সে তখন ব্যক্তিগত আলাপচারিতা সর্বকালের চিরকালের হয়ে ওঠে।
এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত ইংরাজ সমালোচক পত্রের গৌরবে বিমুগ্ধ হয়ে মন্তব্য করেছেন : “Great letter writers are suppressed novelist, frustrated essayists born before their time.” সত্যকথা, আঁকা থেকে মানুষ যেদিন অক্ষর বা লিপি আবিষ্কার করতে শিখেছে, হয়তো সেদিন থেকেই পত্রসাহিত্যের জন্ম হয়েছে। তবে মহান ঔপন্যাসিক প্রাবন্ধিকের লেখনীর দ্বারা পত্রসাহিত্যের গৌরব বৃদ্ধি পেয়েছে।
ডায়েরিকে একাধিক নামে অভিহিত করা হয়, যেমন—দিনলিপি, দিনপঞ্জী, রোজনামচা ইত্যাদি। দিনপঞ্জী বা ডায়েরি বলতে বোঝায় একটি দিন কীভাবে অতিবাহিত হল তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ। অর্থাৎ বিস্মরণের বালুতটে দাঁড়িয়ে স্মরণের ডালি সাজিয়ে মানুষ আপন কথা আপন অভিজ্ঞতাকে স্মরণীয় করে তুলতে দিনের শেষে একাকী নির্জনে খাতার পাতা কলমের আঁচড়ে ভরিয়ে তোলে, যা প্রাত্যহিক দিনচর্যার দিনলিপি রূপেই চিহ্নিত হয়। এই দিনলিপি রচনায় প্রয়োজন ও অপ্রয়োজনের কোনো বিধিবদ্ধ নিয়ম নেই, মানুষের অন্তরের সকল কথাই এখানে ঠাঁই পেয়ে থাকে। হয়তো সাহিত্যের ক্ষেত্রে ডায়েরির অস্তিত্ব খুব একটা স্বীকৃত নয়, তবুও এর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।
দৈনন্দিন জীবনে মানুষকে নানা ধরনের কাজকর্মের দ্বারস্থ হতে হয়। কতটা কাজের কতটা অকাজের তা হিসাব করা ডায়েরির কর্ম নয়। ডায়েরি শুধু বহন করে চলে মানুষের প্রতিদিনের বড়ো থেকে তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয়গুলি। প্রাথমিক পর্যায়ে ডায়েরির গুরুত্ব তেমন না থাকলেও সময়ের স্রোতে প্রতিটি দিন যখন একে একে গত হতে থাকে তখন ধীরে ধীরে প্রয়োজনের উচ্চ শিখরে এর ঘটে আরোহণ পর্ব। একটা অজানা অজ্ঞাত মানুষকে সম্যকরূপে চিনতে সাহায্য করে তাঁর স্বহস্ত রচিত ডায়েরি। তাই দেশ নয় মানুষ আবিষ্কারেই ডায়েরির ভূমিকা বড়ো বেশি।
পত্রসাহিত্য ও ডায়েরির তুলনামূলক আলোচনা:
(১) পত্রসাহিত্য মূলত দু’প্রকারের প্রণয় মূলক ও ভাবপ্রধান। প্রেরক ও প্রাপক এই দুজনকে ঘিরেই পত্রসাহিত্যের জন্ম। অন্তরের গোপনতম সত্তা একাগ্র চিত্তে প্রিয় ব্যক্তির নিকট উজার করে দেওয়াই পত্রের মূল লক্ষ্য।
ডায়েরি ব্যক্তি বিশেষের। কর্মক্লান্ত মনের অনুরণিত ধ্বনিই এর বর্ণিতব্য বিষয়। প্রতিদিন বা কয়েকদিন অন্তর তিন্তু ও মধুর অভিজ্ঞতাই এর মূল বিষয়। লেখক আপন মনে ডায়েরি রচনা করে আত্মার সন্তুষ্টি বিধান করে।
(২) পত্রসাহিত্যে ব্যক্তি জীবনের অভিজ্ঞতা ঠাঁই পেলেও, অপরকে তা শুনিয়ে কোনো স্বস্তি নেই। কোনো তথ্যের প্রাধান্য নয়। ভাব ও মনন ক্রিয়াই এর মুখ্য বিষয়, ব্যক্তি জীবনের সুখ-দুঃখ আশা-আকাঙ্ক্ষাই পত্রাকারে আত্মপ্রকাশ করে প্রিয় ব্যক্তির নিকট হস্তান্তরিত হয়।
কিন্তু ডায়েরির একটা বড়ো বৈশিষ্ট্য হল তথ্য প্রাধান্য। দৈনন্দিন জীবনের খুঁটিনাটি জীবনচর্যার তালিকা প্রকাশই এর বিশেষ প্রবণতা, যার দিনে কী পেলাম এবং কী হারালাম এমন একটি হিসাব নিকাশই ডায়েরির মুখ্য বিষয়।
(৩) পত্রসাহিত্যে লেখকের ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ কামনা-বাসনা অনুভূতি প্রকাশ পাওয়ায় তা সর্বদাই সরস রচনায় অভিষিক্ত হয়। পত্রসাহিত্য পাঠ করতে যেমন ভালো লাগে তেমনি লেখকের কল্পনা রাজ্যের সন্ধান পেয়ে পাঠক আনন্দিত হয়।
ডায়েরি দৈনন্দিন জীবনের কড়চা। একটা সাংবাদিকমুলক রীতি এর মধ্যে প্রচ্ছন্ন থাকে। সেখানে কেবলমাত্র ঘটনার বিবরণী সমগ্রকে গ্রাস করে ফেলে। তাই অনেক সময় ডায়েরি পাঠকের কাছে নীরস হয়ে পড়ে।
(৪) সুপ্রাচীনকাল থেকে পত্রের সৃষ্টি। গ্রিক পুরাণে যেমন পত্রের ব্যবহার পাই, অনুরূপ ভারতীয় পুরাণে নলদময়ন্তী উপখ্যানে হাঁসের পায়ে বেঁধে পত্র প্রেরণের কাহিনিও পাই। ঐতিহাসিক দিক থেকে রাজা ভূস্বামীদের দ্বারা বিশেষ কার্যোপলক্ষ্যে পত্র রচিত হত। তা বিভিন্ন দেশের ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি।
ডায়েরি রচনায় ব